1
সশস্ত্র পাহারায় বালু উত্তোলন: আতঙ্কে এলাকাবাসী, ঝুঁকিতে জাতীয় অবকাঠামো

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা ইউনিয়নের আলোকদিয়ারচর এলাকায় যমুনা নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অবৈধ বালু উত্তোলন সিন্ডিকেট এখন সরাসরি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর জন্য হুমকিতে পরিণত হয়েছে। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও বিদ্যমান আইন অমান্য করে দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ৭ ও ৮ নম্বর টাওয়ার সংলগ্ন এলাকা থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, টাওয়ারের অত্যন্ত নিকটবর্তী এলাকায় ভারী ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনার ফলে নদীর তলদেশ অস্বাভাবিকভাবে গভীর হয়ে পড়েছে। এতে স্রোতের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে তীব্র ভাঙন সৃষ্টি হচ্ছে, যা টাওয়ারগুলোর ভিত্তিকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, যেকোনো সময় টাওয়ার নদীগর্ভে বিলীন হলে তা বৃহত্তর অঞ্চলের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থায় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের মূলহোতা হিসেবে এলাকায় পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তি সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন—আঃ রশিদ (পিতা: ফকির মাদবর), ইউনুস (পিতা: আঃ লতিফ), ষন্তস (পিতা: আঃ জলিল মোল্লা), আঃ মোতালেব (শহীদ বেপারি), আমিরুল (পিতা: আঃ রশিদ), মনোয়ার (পিতা: আঃ লতিফ), মঞ্জু মেম্বার (পিতা: আমজাদ), রঞ্জু (পিতা: আমজাদ), আলম (পিতা: আঃ লতিফ), জাহাঙ্গীর (পিতা: আঃ মজিদ), আঃ রাজ্জাক (পিতা: আফজাল), শাহ আলম (পিতা: নজর আলী), আক্তার হোসেন (পিতা: জুলহাস), জুলহাস (পিতা: আরদোস আলী), বাবু (পিতা: আঃ মজিদ), সিরাজুল (পিতা: আঃ ফকির) এবং আঃ করিম (পিতা: লাল চান)। এরা সবাই শিবালয় উপজেলার তেওতা ইউনিয়নের আলোকদিয়া চরের বাসিন্দা।
এলাকাবাসী জানান , এই চক্রের সহায়তায় ১০–১২ জনের একটি সশস্ত্র গ্রুপ নিয়মিত এলাকায় অবস্থান করে এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যমকর্মীদের ঘটনাস্থলে প্রবেশে বাধা দেয়। ফলে কার্যত ভেঙে পড়েছে স্থানীয়দের প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নামধারী কিছু নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততা রয়েছে, যা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণকে প্রভাবিত করছে বলে তাদের ধারণা। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষ দায় স্বীকার করেনি, অভিযোগটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপকভাবে আলোচিত।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—পর পর বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে এই অবৈধ বালু উত্তোলনের সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরও কার্যক্রম বন্ধ হয়নি; বরং একইভাবে ড্রেজিং চলমান রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এতে করে আইন প্রয়োগ ও প্রশাসনিক তৎপরতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ও ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
আইন অনুযায়ী, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ৬২ ধারা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জনবসতির নিকটবর্তী এলাকা থেকে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ করেছে। পাশাপাশি উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন সংলগ্ন এলাকায় এ ধরনের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বেআইনি। এ অপরাধে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানা এবং ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এলাকাবাসী জানান, জাতীয় গ্রিড টাওয়ার ও বসতভিটা রক্ষায় তারা একাধিকবার মানববন্ধনসহ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করেছেন, কিন্তু দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এতে তারা চরম উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিষা রানী কর্মকার বলেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবিলম্বে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, ড্রেজার জব্দ, দায়ীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রুজু এবং নদীতীর সংরক্ষণে জরুরি পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ অবকাঠামোসহ বিস্তীর্ণ জনপদ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।
সব মিলিয়ে, আলোকদিয়ারচরের এই অবৈধ বালু উত্তোলন এখন শুধু একটি স্থানীয় সমস্যা নয়—এটি জাতীয় অবকাঠামো সুরক্ষা ও আইনের শাসনের জন্য একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।







